এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে; এদেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ত্রিশ লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। একাত্তরের আগুনঝরা দিনগুলোতে পুরো বাংলাদেশ মৃত্যু-উপত্যকায় পরিণত হয়। দেশজুড়ে তৈরি হওয়া অসংখ্য বধ্যভূমিতে মাটিচাপা দেওয়া হয় লক্ষ লক্ষ শহীদকে। সেই সময় যুদ্ধ, মৃত্যু, স্বাধীনতা একই উজান স্রোতে বয়ে যায়; ছড়িয়ে থাকে বধ্যভূমিতে শহীদের শেষ নিঃশ্বাস স্বাধীনতার বসন্ত বাতাস। এই উপন্যাসে ফুলঝুরি, ফুলতারা এবং সিদ্ধেশ্বরী এই তিনটি গ্রামের শহীদদের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ফুলঝুরি গ্রামকে তো পাকিস্তানি সৈন্যরা কসাইখানায় পরিণত করেছিল। ফুলতারার কবলার বিল এবং সিদ্ধেশ্বরীর রাংতার বিল ধারণ করেছিল অসংখ্য শহীদের লাশ। শুধু শহীদ হওয়া নয়, অকালে পৃথিবীর বুক থেকে ঝরে পড়া নয়—পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে এইসব গ্রামের মানুষের প্রতিরোধও মূর্ত হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসে। এই মানুষগুলোর দুঃখ-বেদনা আর সংগ্রামের সাথি মুক্তিযোদ্ধা আজমল। তারই মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন তিনটি গ্রামের মানুষের সংগ্রামী উপাখ্যানকে একসূত্রে গেঁথেছেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

সেলিনা হোসেনের জন্ম ১৪ জুন, ১৯৪৭, রাজশাহী শহর । পিতা এ কে মোশাররফ হোসেন রাজশাহী রেশমশিল্প কারখানার পরিচালক ছিলেন। মাতার নাম মরিয়মন্নেসা বকুল । পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান। ষাটের দশকের মধ্যভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে লেখালেখির সূচনা। সেই সময়ের লেখা নিয়ে প্রথম গল্পগ্রন্থ 'উৎস থেকে নিরন্তর' প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। তারপর উপন্যাস, গল্প, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ, ভ্রমণসহ লেখালেখির নানাক্ষেত্রে তিনি বিচরণ করেছেন, করছেন। সেলিনা হোসেনের লেখার জগৎ বাংলাদেশের মানুষ, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তাঁর উপন্যাসে প্রতিফলিত হয় সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংকটের সামগ্রিকতা। বঙালির অহঙ্কার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তাঁর লেখায় নতুন মাত্রা অর্জন করে। সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮০), একুশে পদক (২০০৯) ও স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৮) অর্জন করেন। এছাড়া ১৯৯৪-৯৫ সালে তিনি তাঁর ত্রয়ী উপন্যাস ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ রচনার জন্য ফোর্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ পেয়েছিলেন। ২০১০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি-লিট উপাধি পান। ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি, কানাড়ি, রুশ, মালে, ফরাসি প্রভৃতি ভাষায় তাঁর বেশ কয়েকটি গল্প অনূদিত হয়েছে ১৯৮৭ সালে 'হাঙর নদী গ্রেনেড এবং ১৯৮৩ সালে 'নীল মহূরের যৌবন' এবং ১৯৯৯ সালে টানাপোড়েন" উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ পায়। পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ‘যাপিত জীবন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে 'নিরস্তর ঘণ্টাধ্বনি' উপন্যাস পাঠ্যসূচিভুক্ত।

No review found

Write a review

    Bad           Good
content title
Loading the player...
Boighor

Stay Connected